স্টাফ রিপোটার, টাঙ্গাইল :১৩ আগস্ট-২০২৫,বুধবার।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ত্রিভুজ পরকিয়ায় এক প্রেমিকের হাতে আরেক প্রবাসী প্রেমিক ফিরোজ মিয়া, মধুপুরে টাকার জন্য মাদকাসক্ত ছেলের হাতে মা রাজিয়া বেগম খুন এবং গোপালপুরে চালক বেল্লাল হোসেনকে খুন করে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ছিনতাই হয়েছে। এসব ঘটনা সমাজ-নাগরিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জানাগেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে জেলায় ৪৬টি খুন হয়েছে। এসব ঘটনার মামলায় এজাহারনামীয় ১৬৫ জন আসামির মধ্যে ৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জেলায় সুনির্দিষ্টভাবে চাঁদাবাজির কোন মামলা দায়ের হয়নি। সামজিক অবক্ষয় ও খুনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুশীল সমাজ। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় ১৩টি থানায় রয়েছে। থানাগুলোতে জানুয়ারি ১ তারিখ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত দায়েরকৃত খুনের মামলাগুলোয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরমধ্যে টাঙ্গাইল সদর থানার ৯টি হত্যা মামলায় ১৫ জন আসামির মধ্যে ৯ জন গ্রেপ্তার, দেলদুয়ারে ৩টি হত্যা মামলায় ২০ জন আসামির মধ্যে ৪ জন, গোপালপুরে ২টি হত্যা মামলায় ১০ জন আসামির মধ্যে ১ জন, ঘাটাইলে ৪টি হত্যা মামলায় ৮ জন আসামির মধ্যে ৬ জন, মির্জাপুরে ৮টি হত্যা মামলায় ২৮জন আসামির মধ্যে ১২ জন, নাগরপুরে ৩টি হত্যা মামলায় ১৬জন আসামির মধ্যে ৯ জন, সখীপুরে ৪টি হত্যা মামলায় ৭ জন আসামির মধ্যে ৫ জন, বাসাইলে ১টি হত্যা মামলায় ৬ জন আসামির মধ্যে ২ জন, কালিহাতীতে ৫টি হত্যা মামলায় ৮ জন আসামির মধ্যে ৬ জন, মধুপুরে ৫টি হত্যা মামলায় ৩৪ জন আসামির মধ্যে ১৪ জন এবং ধনবাড়ীতে ২টি হত্যা মামলায় ১৩ জন আসামির মধ্যে ৫ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। এছাড়া ভূঞাপুর এবং যমুনা সেতু পূর্ব থানায় উল্লেখিত সময়ের মধ্যে কোন হত্যা মামলা সংঘটিত হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক(সুজন) এর টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক তরুণ ইউসুফ জানান, পুলিশের তথ্য অনুযায়ী একটি মাত্র জেলায় সাত মাসে ৪৬টি খুনের মামলা খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহনকরে। মামলার বাইরে অজ্ঞাত আরো খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। টাঙ্গাইলে তো বটেই সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অধিকতর তৎপর হওয়া জরুরি। এছাড়া এ কিষয়ে সরকারকেও কঠোর হতে হবে।
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিষয়ে বাংলাদেশে প্রথম অধ্যাপক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অপরাধ বিজ্ঞানী ডক্টর মুহাম্মদ উমর ফারুক জানান, দেশে বর্তমানে অস্থিরতা বিরাজমান ও হত্যাকা- বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের সামাজিক অস্থিরতাকে বেশি বেগবান করছে। একই সাথে পারিবারিক জীবনকে অস্থিতিশীল এবং নাগরিক জীবনকে উদ্বিগ্ন এবং উৎকণ্ঠনার মধ্যে রাখছে। এছাড়া অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক অবক্ষয়-প্রতিহিংসার কারণেও খুন বাড়ছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ঐক্যমত না আসা পর্যন্ত সামনের দিনগুলোতে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ ও ডাকাতি বাড়তে পারে। এরজন্য সামজিক মূল্যবোধ ও সহশীলতা বৃদ্ধি, সমস্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধীদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(এএসপি) কাজী শাহনেওয়াজ জানান, জেলার অধিকাংশ হত্যা জমিজমা এবং পারিবারিক-সামাজিক বিরোধে হয়েছে। তবে অপরাধ দমন এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সদা তৎপর। অনেক সময় হত্যাকা-গুলোয় রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হয়।
তিনি জানান, টাঙ্গাইলে সুনির্দিষ্টভাবে কোন ভুক্তভোগী চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে চলেছে। অপরাধ প্রতিরোধে সাধরাণ মানুষকে আরো সচেতন এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।