তিন কিলোমিটার সড়কের জন্য ১২ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষের চরম দুর্ভোগ
Update Time :
সোমবার, ১১ আগস্ট, ২০২৫
/
৫৪৭
Time View
/
Share
এইচএম মোকাদ্দেস , সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের খোর্দ্দ গজাইল থেকে খানপুর পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রাস্তা আজও রয়ে গেছে অবহেলিত। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। কাচা সড়কে থৈথৈ করে পানি। রাস্তা না থাকায় এই গ্রামের ছেলে মেয়েদের হচ্ছে না ভালো বিয়ে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও এই সড়কে লাগেনি কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া । সামান্য বৃষ্টি শুরু হলেই রাস্তায় কাদা জমে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এতে মালবোঝাই ভ্যান, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল কোনোটিই নির্বিঘ্নে চলতে পারে না। প্রায়ই মানুষ পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙছে, কেউবা কাদার নিচে পড়ে গড়াগড়ি খেয়ে আহত হচ্ছেন। বিশেষ করে চরম বিপাকে পড়ছে স্কুল,কলেজগামী শিক্ষক শিক্ষার্থী, হাট বাজার ও অফিসগামী মানুষ । একটু বৃষ্টি হলেই শিক্ষার্থীরা আর ঘর থেকে বের হতে পারে না। ক্ষতবিক্ষত, ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা রাস্তায় চলতে গিয়ে নিত্যদিন ভোগান্তি পোহাচ্ছে ১২ গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। তবে গ্রামবাসীরা নিজেদের প্রয়োজনেই মাটি ফেলে কাঁচা রাস্তা তৈরি করলেও আজ পর্যন্তও তা পাকা হয়নি সড়কটি।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানাযায়, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের খোর্দ্দগজাইল থেকে খানপুর পর্যন্ত তিন কিলোমিটার কাচা সড়কটি উল্লাপাড়া, চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া থানার সংযোগস্থলে অবস্থিত। এ সড়কটি দিয়ে বাগমাড়া, বেদকান্দি, খানপুর, মাদারবাড়িয়া, দাসমরিচ, কালিয়াঞ্জিরি, সুবদ্ধিমরিচ, কোমলমরিচ, পান্তাপাড়া দক্ষিণপাড়া, রঘুনাথপুর ও চন্ডিপুরের ১০/১২টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করছেন দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে। বর্ষা এলেই পুরো রাস্তা কাদায় ভরে যায়। সৃষ্টি হয় গর্ত আর জলাবদ্ধতা। একদিকে নেই পাকা রাস্তা, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কোনো সংস্কারও হয়নি স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত। পাশে রয়েছে ধলার বিল, যেখানে সবচেয়ে বেশি কৃষি আবাদ হয়ে থাকে। কিন্তু রাস্তাটি চলাচলের অযোগ্য হওয়ায় কৃষকরা তাদের ফসল সময়মতো বাজারে নিতে পারছেন না। এতে করে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। খোর্দ্দ গজাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, খোর্দ্দ গজাইল দাখিল মাদ্রাসা ও খোর্দ্দ গজাইল কবরস্থান হাফিজিয়া মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতেও শিক্ষার্থীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। এতে করে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ স্কুলমুখী হওয়ার আগ্রহ দিন দিন হারিয়ে ফেলছে।
রাস্তার এই দুরবস্থার কারণে অসুস্থ্য ও সিজারিয়ান রোগীদেরও সহজে উপজেলা নিয়ে যেতে পারছে না। এমনকি মানুষ মারা গেলে কবরস্থানে নিতে গিয়েও হিমশিম খেতে হয়।
স্থানীয় মোঃ ফরিদ মিয়া ও মোঃ বাবলু সরকার বলেন, বৃষ্টি বাদল ছাড়ায় রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। আমরা খুবই অবহেলিত। গাড়ি পাকা রাস্তায় রেখে আমাদের হেঁটে যেতে হয়। এই গ্রামের ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয় না সহজে। এই দেশ স্বাধীন হলেও আমাদের গ্রামের মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। মানুষ মারা গেলে কবরস্থানে নিয়ে যেতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। গর্ভবতী মহিলাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ঝাকিতে রাস্তাতেই প্রসব হয়ে যায়।সরকারের কাছে দাবী জানাই, দ্রুত রাস্তাটি পাকাকরণ করা হোক।
মিশু গাড়ি চালক মোঃ শহীদুল ইসলাম ও ভ্যানচালক মোঃ শাহাদত মন্ডল বলেন, গাড়ি নিয়ে এই গ্রামে প্রবেশই করা যায় না। গাড়ি নিয়ে ঢুকলেও গাড়ি কাঁদা মাটিতে আটকে যায়। দেখা যায়, গাড়ির মোটর ভেঙ্গে যায়। লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। অসুস্থ মানুষ ফোন করলেও যেতে পারি না। সরিষা বা ধান নিয়ে যেতে পারিনা। গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তাটি হয়ে গেলে আমাদের সকল সমস্যার সমাধান হবে।
চয়ড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ নাজিম সরকার বলেন, আমাদের স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটি খুবই খারাপ। বৃষ্টি হইলে হাটাচলা করা অসম্ভব হয়ে যায়। রাস্তা হলে আমাদের স্কুলমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়বে।
কৃষক মোঃ আবু হানিফ বলেন, এই রাস্তায় হাঁটতেও পারিনা, তাই জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে হয়। প্রতিটি ধাপে ধাপে আমাদের সমস্যা হচ্ছে। একটা রাস্তা হইলে খুবই ভালো হয়।
কৃষক আবু তাহের প্রামাণিক বলেন, রাস্তা খারাপ হওয়ায় কৃষি পণ্য নিয়ে সময়মতো যেতে পারিনা। জিনিসপত্র সঠিক সময়ে বাজারে নিয়ে বেচতে না পারায় দাম পাই না। ছেলে মেয়ের বিয়ে দিতে পারিনা। এরকম খারাপ রাস্তায় দেখে মানুষজন বিয়ে করতে রাজী হয় না।
কলেজ শিক্ষার্থী সাদিয়া খাতুন বলেন, রাস্তা খারাপের জন্য আমরা ভালো ভাবে কলেজে যেতে পারিনা। একটু বৃষ্টি হলেই আমাদের কলেজে যেতে সমস্যা হয়। তাই আমার দাবি দ্রুত যেনো রাস্তাটি পাকাকরণ করা হয়।
খোর্দ্দগজাইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারজানা খন্দকার বলেন, অনেক দূর থেকে শিক্ষার্থীরা আসে। রাস্তা খারাপ হওয়ায় তাদের স্কুলমুখী হওয়ার প্রবণতা দিন দিন কমে যাচ্ছে । দেখা যায়, এই রাস্তার কারণেই প্রতি ২৫ জনের মধ্যে ১০ জন শিক্ষার্থী আসে।
স্থানীয় পংখারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রহমতুল বারী বলেন, আমাদের গ্রামটি অবহেলিত। বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। রাস্তার দূর্ভোগের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গাড়ি ভেঙ্গে যায়। অনেক জনপ্রতিনিধি আছে, তারা শুধু আশ্বাস দিয়েছে। তবে কাজ হয়নি।
এলাকাবাসীর দাবি দ্রুত রাস্তাটি পাকাকরণ করা হলে এলাকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে তারা আশা করছে।
এ বিষয়ে উল্লাপাড়া এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল্লাহ জানান, সিরাজগঞ্জ উন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প চালু হচ্ছে। এই প্রকল্পে সড়কটি অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। আশা করি প্রজেক্টটি একনেক থেকে অনুমোদন পেলেই খোর্দ্দগজাইল থেকে খানপুর পর্যন্ত সড়কটির কাজ শুরু করা হবে।###